দাঁতের টার্টার থেকে হওয়া দুর্গন্ধ দূর করার উপায় কি?

দাঁতের টার্টার.png

দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি সাধারণ স্বাস্থ্য-সচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনো ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ বা রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়। দাঁত বা মাড়ি-সংক্রান্ত সমস্যা থাকলে একজন নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দাঁতের টার্টার বা দাঁতের পাথর অনেকের কাছেই একটি সাধারণ সমস্যা। কিন্তু এই সাধারণ সমস্যাটিই ধীরে ধীরে মুখের দুর্গন্ধ, মাড়ির প্রদাহ এবং দাঁতের ক্ষতির মতো সময়ের সঙ্গে আরও জটিল সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যখন দাঁতের গোড়ায় হলদে বা বাদামী শক্ত স্তর জমে যায়, তখন সাধারণ টুথব্রাশ দিয়ে এটি অপসারণ করা যায় না।

অনেকেরই নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপের অভ্যাস থাকে না। ফলে দাঁতের টার্টার জমে গিয়ে মুখে অস্বস্তিকর গন্ধ তৈরি হয়, যা সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে অস্বস্তির কারণ হতে পারে। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো দাঁতের টার্টার থেকে হওয়া দুর্গন্ধ কেন হয়, কীভাবে দূর করা যায় এবং ভবিষ্যতে কীভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আপনি যদি দীর্ঘদিন ধরে মুখের দুর্গন্ধে ভুগে থাকেন এবং বুঝতে না পারেন এর আসল কারণ কী, তাহলে এই গাইডটি বিষয়টি বুঝতে এবং প্রাথমিকভাবে করণীয় সম্পর্কে ধারণা দিতে সাহায্য করবে।

দাঁতের টার্টার কী এবং এটি কীভাবে তৈরি হয়?

দাঁতের টার্টার মূলত প্লাক জমে শক্ত হয়ে যাওয়ার ফল। আমরা যখন খাবার খাই, তখন দাঁতের উপর একটি পাতলা আঠালো স্তর তৈরি হয়, যাকে প্লাক বলা হয়। নিয়মিত ও সঠিকভাবে ব্রাশ না করলে এই প্লাক ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে টার্টারে পরিণত হয়। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে প্লাক সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে টার্টারে পরিণত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হতে পারে, তবে এটি ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। টার্টার সাধারণত দাঁতের গোড়ায় এবং মাড়ির কাছে বেশি জমে। একবার এটি শক্ত হয়ে গেলে সাধারণ ব্রাশিং দিয়ে আর দূর করা যায় না।

দাঁতের টার্টার থেকে মুখে দুর্গন্ধ কেন হয়?

টার্টার জমলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে। এই ব্যাকটেরিয়া খাবারের অবশিষ্টাংশ ভেঙে দুর্গন্ধযুক্ত যৌগ (volatile sulfur compounds) তৈরি করতে পারে, যার ফলে মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। এছাড়া টার্টার মাড়িতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যাকে জিনজিভাইটিস বলা হয়। মাড়ি ফোলা, রক্তপাত এবং পুঁজ তৈরি হলে দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়। তাই টার্টার শুধু বাহ্যিক সমস্যা নয়, এটি মুখের ভেতরের স্বাস্থ্যের সাথেও জড়িত।

ডেন্টাল স্কেলিং: প্রচলিত ও কার্যকর চিকিৎসা

দাঁতের টার্টার দূর করার একটি প্রচলিত ও কার্যকর চিকিৎসা হলো ডেন্টাল স্কেলিং। এই প্রক্রিয়ায় একজন নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসক বিশেষ ডেন্টাল যন্ত্রের সাহায্যে দাঁতের উপর জমে থাকা শক্ত টার্টার অপসারণ করেন। বাংলাদেশের অনেক ডেন্টাল ক্লিনিকে এই সেবা পাওয়া যায়। যদি দুর্গন্ধের প্রধান কারণ টার্টার বা মাড়ির প্রদাহ হয়, তাহলে স্কেলিংয়ের পর দুর্গন্ধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

সঠিক ব্রাশিং ও ফ্লসিং পদ্ধতি

দিনে অন্তত দুইবার সঠিক নিয়মে ব্রাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাশ করার সময় দাঁতের সামনের, পেছনের এবং চিবানোর অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়া ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করলে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাবারের কণা দূর হয়। শুধুমাত্র ব্রাশ দিয়ে সব অংশ পরিষ্কার করা সবসময় সম্ভব হয় না। তাই নিয়মিত ফ্লস ব্যবহার করাও উপকারী।

মাউথওয়াশ ব্যবহার কি উপকারী?

অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে মুখের ব্যাকটেরিয়া কমে এবং সাময়িকভাবে মুখের দুর্গন্ধ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, মাউথওয়াশ টার্টার দূর করতে পারে না। এটি একটি সহায়ক উপায় মাত্র। তাই ব্রাশিং ও স্কেলিংয়ের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং অতিরিক্ত ওরাল কেয়ারের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

অ্যালকোহলযুক্ত মাউথওয়াশ সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই ডেন্টিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের জন্য উপযুক্ত মাউথওয়াশ নির্বাচন ও ব্যবহার করা উচিত।

খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব

অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার দাঁতের প্লাক দ্রুত বাড়ায়। ফলে টার্টার জমার ঝুঁকি বাড়ে। নিয়মিত পানি পান করা, কাঁচা ফল ও সবজি খাওয়া এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় কম খাওয়া দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। বিশেষ করে খাবারের পর কুলি করলে প্লাক জমা কম হয়।

কখন ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া উচিত?

যদি নিয়মিত ব্রাশ করার পরও মুখে দুর্গন্ধ থাকে, মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে বা দাঁতের গোড়ায় শক্ত আস্তরণ দেখা যায়, তাহলে একজন নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নিলে বড় জটিলতা এড়ানো সম্ভব। অনেক সময় চিকিৎসা না করলে বা দীর্ঘদিন যত্ন না নিলে দাঁত নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধের উপায়

নিয়মিত যত্ন নিলে টার্টার জমার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিয়মিত ব্রাশিং, ফ্লসিং, ডেন্টিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস টার্টার জমার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। এছাড়া ধূমপান পরিহার করলে দাঁতের দাগ ও টার্টার কম জমে। ছোট থেকেই সঠিক ওরাল কেয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে ভবিষ্যতে বড় সমস্যার সম্ভাবনা কমে যায়।

আরও পড়ুনঃ দাঁতের ব্যথায় ভুল চিকিৎসা করছেন না তো? হাটের ওষুধের আসল সত্য

প্রশ্ন এবং উত্তর সমূহ

১. দাঁতের টার্টার কি ঘরোয়া উপায়ে পুরোপুরি দূর করা যায়?

না, একবার টার্টার শক্ত হয়ে গেলে ঘরোয়া উপায়ে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। ব্রাশ ও মাউথওয়াশ প্লাক কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু শক্ত পাথর অপসারণের জন্য স্কেলিং প্রয়োজন। তাই নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসকের মাধ্যমে স্কেলিং করানোই সাধারণভাবে সুপারিশ করা হয়।

২. স্কেলিং করলে দাঁত কি দুর্বল হয়ে যায়?

অনেকের ধারণা স্কেলিং করলে দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা। একজন নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসকের মাধ্যমে সঠিকভাবে স্কেলিং করা হলে সাধারণত দাঁতের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং এটি মাড়ির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।

৩. বছরে কতবার স্কেলিং করা উচিত?

অনেক নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসক নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপের অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট সময় পরপর স্কেলিংয়ের পরামর্শ দেন। কত ঘন ঘন স্কেলিং প্রয়োজন, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে কারও যদি দ্রুত টার্টার জমে বা মাড়ির সমস্যা থাকে, তাহলে ডেন্টিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী বছরে দুইবারও প্রয়োজন হতে পারে। নিয়মিত চেকআপ করলে সঠিক সময় নির্ধারণ সহজ হয়।

৪. টার্টার কি দাঁত নষ্ট করতে পারে?

হ্যাঁ, দীর্ঘদিন টার্টার জমে থাকলে মাড়ির প্রদাহ হয় এবং দাঁতের গোড়া দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে দাঁত নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা না করলে দীর্ঘমেয়াদে দাঁত হারানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই অবহেলা করা উচিত নয়।

৫. শুধু মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে কি দুর্গন্ধ দূর হবে?

মাউথওয়াশ সাময়িকভাবে দুর্গন্ধ কমাতে পারে, কিন্তু এটি মূল সমস্যা সমাধান করে না। যদি টার্টার বা মাড়ির সংক্রমণ থাকে, তাহলে শুধু মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে মূল সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হয় না।

৬. দাঁতের টার্টার কি শিশুদেরও হতে পারে?

হ্যাঁ, সঠিকভাবে দাঁত পরিষ্কার না করলে শিশুদেরও টার্টার হতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই সঠিক ব্রাশিং শেখানো জরুরি। প্রয়োজনে শিশুদের ডেন্টাল চেকআপ করানো উচিত।

৭. ধূমপান কি টার্টার বাড়ায়?

ধূমপান প্লাক ও টার্টার জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং মাড়ির রোগের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করে।

৮. মুখে দুর্গন্ধ থাকলেই কি টার্টার আছে বোঝায়?

সবসময় নয়। মুখের দুর্গন্ধের কারণ বিভিন্ন হতে পারে, যেমনঃ হজমের সমস্যা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা জিভে ব্যাকটেরিয়া জমা। তবে টার্টার একটি সাধারণ কারণ, তাই সন্দেহ হলে পরীক্ষা করা উচিত।

৯. ফ্লস ব্যবহার না করলে কী সমস্যা হতে পারে?

ফ্লস ব্যবহার না করলে দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে থাকে, যা প্লাক ও টার্টার তৈরিতে সহায়তা করে। ফলে দুর্গন্ধ ও মাড়ির সমস্যা বাড়তে পারে। তাই ফ্লসিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১০. টার্টার দূর করার পর কীভাবে দুর্গন্ধ প্রতিরোধ করা যায়?

স্কেলিংয়ের পর নিয়মিত ব্রাশ, ফ্লস, মাউথওয়াশ ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট সময় পরপর ডেন্টাল চেকআপ করলে টার্টার পুনরায় জমার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

শেষ কথা

দাঁতের টার্টার থেকে হওয়া দুর্গন্ধ একটি সাধারণ কিন্তু উপেক্ষা করার মতো সমস্যা নয়। এটি ধীরে ধীরে মাড়ির রোগ ও দাঁতের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নিয়মিত ওরাল কেয়ার এবং প্রয়োজনে নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে টার্টার ও মুখের দুর্গন্ধের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। দীর্ঘদিন দুর্গন্ধ বা মাড়ির সমস্যা থাকলে নিজে চিকিৎসা না করে নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

তথ্যসূত্রঃ

  • American Dental Association (ADA)
  • Centers for Disease Control and Prevention (CDC): Oral Health
  • World Health Organization (WHO): Oral Health

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *